বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, সার, খাদ্যদ্রব্য- সরকার নিজ সংকট জনগণের উপর চাপাচ্ছে
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ৬ আগস্ট ২০২২ | অনলাইন সংস্করণ
২০২০ সাল থেকে লাগাতারভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটে চলছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ডিজেল-কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের মূল্য একদফা বেড়েছে। তারপর লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। এখন ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে কলকারখানায় উৎপাদন কম। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের সংকটে কৃষি এবং শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আরো হবে।
দেশের নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশ ছোঁয়া হলেও তার দায়িত্ব সরকার নিতে নারাজ। এ প্রশ্নে তাদের যুক্তি হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। এখানে তাদের কোনো হাত নেই। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে কিছু কোম্পানির মজুতদারীকে লোকদেখানো দায়ী করছে অবশ্য।
এতোদিন সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের গলাবাজী শুনে মানুষের কান ভারী হয়ে গেছে যে, দেশ নাকি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেটাই যদি হয় তা হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সমস্যা হবে কেন বা খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হবে কেন? যে সত্যটিকে সরকার ও নেতারা গোপন করে গেছে যে, বহু খাদ্যপণ্যের জন্যই দেশ বিদেশের-উপর নির্ভরশীল। যেমন, গম, ভোজ্য তেল, ডাল, চিনি- এসবের ক্ষেত্রে দেশ প্রধানতই বিদেশ-নির্ভর। এমনকি প্রতি বছর ২০/৩০ লক্ষ টন চালও আমদানি করতে হয়। সুতরাং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কথাটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা সেটা আজ সংকটে পড়ে খোলামেলা প্রকাশ হচ্ছে। উপরন্তু যেসব খাদ্য দেশে উৎপাদিত হয়, সেগুলোর উৎপাদনে যে সার, বীজ, কীটনাশকসহ উৎপাদন উপকরণ লাগে তা বিদেশ থেকেই আমদানি করা হয়। ধান উৎপাদনে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ লাগে সেচের জন্য। সেগুলোও ব্যাপকভাবে বিদেশ-নির্ভর। ঠিক এ কারণেই আজ ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। দেশ খাদ্যে প্রকৃতই স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে এটা কখনো ঘটতো না।
দেশের কৃষি জমি ধ্বংস করে, দেশের গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সম্পদ নষ্ট করে বিদেশিদের লুটপাটের অভয়ারণ্যের জন্য হাসিনা-আওয়ামী সরকার ১০০টা শিল্পাঞ্চল তৈরি করছে। আর খাদ্যপণ্য এবং ঘরভাড়া বৃদ্ধির কারণে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন করলে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং শ্রমিকদের কটাক্ষ করে বলেন আন্দোলনের কারণে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের না খেয়ে মরতে হবে।
যে ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর মজুতদারী এবং সিন্ডিকেটদের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকার দায়ী করছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতেও তারা অক্ষম। কারণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটদের উপরই নির্ভর করে তাদের ক্ষমতার মসনদ। মন্ত্রী-এমপিরাও ব্যবসায়ী। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আওয়ামী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মজুতদারী, অতি মুনাফা, লুটপাট, দুর্নীতি- যাদের সাথে আমলাদের একটা অংশও জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার বাগাড়ম্বর করেছেন বছরের পর বছর ধরে। হাতিরঝিলে ১০ কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ উৎসবে লোডশেডিং যাদুঘরে পাঠানোর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মাত্র ৪ মাস পর সারাদেশে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকাভিত্তিক ১-২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নিজে দিলেও বাস্তবে শহরে লোডশেডিং হচ্ছে যখন তখন, দিনে ২-৪ ঘণ্টা। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে বিদ্যুৎ থাকে না দিনে ৬-৭ ঘণ্টার বেশি। বাসাবাড়ীর রান্নার গ্যাসের অপ্রতুলতা এলাকা ভেদে সারা বছরই।
লোডশেডিং-এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কম। বিদেশে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। ফলে আমদানি খরচ বেশি, তেল বাঁচাতে হবে, তাই লোডশেডিং। গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ-এর দাম বৃদ্ধির ষড়যন্ত্রও চলছে।
এর জন্যও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমেরিকা-জোট কর্তৃক রাশিয়ার উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারির যুক্তি দেয়া হচ্ছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার বিষয়টা যে ছিল সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর একটা কর্মসূচি এবং নিজেদের ঘরাণার ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করার কর্মসূচি তা এতে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মাসেতুর গলাবাজি এখানে হচ্ছে না কেন?
দেশে প্রচুর গ্যাস আছে। সরকার এই গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা না করে বিদেশ নির্ভর জ্বালানি নীতি নিয়েছে। ২০১৬ সালে হাসিনা-আওয়ামী সরকারের পাওয়ার সিষ্টেম মাষ্টারপ্ল্যানে জ্বালানি আমদানির ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ভাড়াভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল এ সরকার। দুই বছর মেয়াদের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আরো বাড়িয়ে মালিকদেরকে বিরাট মুনাফা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে সরকার। উৎপাদন-সক্ষমতা অনুযায়ী কখনোই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় নি। না হলেও তাদেরকে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে চলেছে। জানা যায় গত এক বছরে এ জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ৫৪ হাজার কোটি টাকা গুণেছে সরকার।
বিদেশ-নির্ভরতা, লুট-পাট, অতিমুনাফা এবং দুর্নীতি হচ্ছে এই লোডশেডিংয়ের মূল কারণ। গ্যাস ক্ষেত্রে ৭% লুটপাট হচ্ছে। এটা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কিউবেক ঘনফুট গ্যাসের দামের সমপরিমাণ।
সরকার পদ্মাসেতু এবং সড়ক-কেন্দ্রীক পরিবহণ খাত পরিচালনা করে ডিজেলের বর্ধিত চাহিদা সৃষ্টি করেছে।
সরকার জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচে সাশ্রয়ী হতে বলেছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি, কর্মকর্তা এবং উচ্চবিত্তদের ঘরের এসি এবং প্রাইভেট কার বন্ধ করলে অনেক জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে। কিন্তু সরকার সেসব না করে তাদের সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।
অথচ ইতিমধ্যে চিটাগাং-এ সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
এগুলো কিসের আলামত? বিদ্যুৎ-ডিজেল-সারের অভাবে কৃষিপণ্য এবং আমন ধানের উৎপাদন কমে যাবে। কারকারখানার উৎপাদন কম হলে রপ্তানি কমে যাবে এবং ডলারের রিজার্ভও কমে যাবে। সরকারের সংকট আরো ঘনীভূত হবে। এখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং সারের মূল্য বৃদ্ধি করলে দ্রব্যমূল্য আরেকদফা বাড়বে। তাই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে কিনা তা আগামীতে দেখার বিষয়। শ্রীলঙ্কায় তো এমন উন্নয়নই ছিল; এবং তা ফেসে যেতে বেশি সময় লাগেনি।
আজকে দেশে এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এবং সাম্রাজ্যবাদীরা। সাম্রাজ্যবাদীরা নিজ নিজ আধিপত্য বিস্তারে যুদ্ধ বাধিয়ে বিশ্বের জ্বালানি, খাদ্যপণ্য সহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করে বিশ্ব জনগণকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর হাসিনা-আওয়ামী সরকার সেই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর উন্নয়নের গান গেয়ে দেশকে আজ মহাসংকটের মুখে এনে ফেলেছে। তারা নিজেদের এ সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে শেষরক্ষা করতে চাচ্ছে। কিন্তু সেটা শেষপর্যন্ত হবে কিনা তা জনগণের আন্দোলন ও সরকারের বিদেশি প্রভুদের দ্বন্দ্বের উপর নির্ভর করবে। কিন্তু জনগণকে নির্ভর করতে হবে নিজেদের শক্তির উপর। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর উন্নয়ন আর সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর আন্দোলন একই বিষয়।
- চলতি বছরে দেশে খাদ্যদ্রব্য চাহিদা এবং আমদানি পরিস্থিতি
- - চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ টন, আমদানি ৭ লাখ টন।
- - গমের চাহিদা ৭৫ লক্ষ টন, আমদানি ৬৪ লক্ষ টন।
- - ডালের চাহিদা ২৬-২৭ লক্ষ টন, আমদানি ১৭ লক্ষ টন।
- - পেঁয়াজের চাহিদা ৩৫ লক্ষ ৫০ হাজার টন, আমদানি ৫.৫০
- লক্ষ টন (চলতি অর্থ বছরে এ পর্যন্ত)।
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা মোট ২২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল গত ২২এপ্রিল ১৪ হাজার ৭৮২ মেগওয়াট। ১৯ জুলাই থেকে ডিজেল চালিত ১ হাজার ৪৯০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। দৈনিক উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। দেশে দিনে গ্যাসের সরবরাহ হতো ৩ কোটি ৩০ লাখ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটের মত দেশীয় খনি থেকে আসা গ্যাস। বাকি ১ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ ৫০ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, সার, খাদ্যদ্রব্য- সরকার নিজ সংকট জনগণের উপর চাপাচ্ছে
২০২০ সাল থেকে লাগাতারভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটে চলছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ডিজেল-কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের মূল্য একদফা বেড়েছে। তারপর লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। এখন ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। ফলে কলকারখানায় উৎপাদন কম। বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের সংকটে কৃষি এবং শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আরো হবে।
দেশের নিত্যপণ্যের মূল্য আকাশ ছোঁয়া হলেও তার দায়িত্ব সরকার নিতে নারাজ। এ প্রশ্নে তাদের যুক্তি হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। এখানে তাদের কোনো হাত নেই। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে কিছু কোম্পানির মজুতদারীকে লোকদেখানো দায়ী করছে অবশ্য।
এতোদিন সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের গলাবাজী শুনে মানুষের কান ভারী হয়ে গেছে যে, দেশ নাকি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেটাই যদি হয় তা হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সমস্যা হবে কেন বা খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হবে কেন? যে সত্যটিকে সরকার ও নেতারা গোপন করে গেছে যে, বহু খাদ্যপণ্যের জন্যই দেশ বিদেশের-উপর নির্ভরশীল। যেমন, গম, ভোজ্য তেল, ডাল, চিনি- এসবের ক্ষেত্রে দেশ প্রধানতই বিদেশ-নির্ভর। এমনকি প্রতি বছর ২০/৩০ লক্ষ টন চালও আমদানি করতে হয়। সুতরাং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কথাটি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা সেটা আজ সংকটে পড়ে খোলামেলা প্রকাশ হচ্ছে। উপরন্তু যেসব খাদ্য দেশে উৎপাদিত হয়, সেগুলোর উৎপাদনে যে সার, বীজ, কীটনাশকসহ উৎপাদন উপকরণ লাগে তা বিদেশ থেকেই আমদানি করা হয়। ধান উৎপাদনে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ লাগে সেচের জন্য। সেগুলোও ব্যাপকভাবে বিদেশ-নির্ভর। ঠিক এ কারণেই আজ ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। দেশ খাদ্যে প্রকৃতই স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে এটা কখনো ঘটতো না।
দেশের কৃষি জমি ধ্বংস করে, দেশের গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সম্পদ নষ্ট করে বিদেশিদের লুটপাটের অভয়ারণ্যের জন্য হাসিনা-আওয়ামী সরকার ১০০টা শিল্পাঞ্চল তৈরি করছে। আর খাদ্যপণ্য এবং ঘরভাড়া বৃদ্ধির কারণে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন করলে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং শ্রমিকদের কটাক্ষ করে বলেন আন্দোলনের কারণে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের না খেয়ে মরতে হবে।
যে ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর মজুতদারী এবং সিন্ডিকেটদের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকার দায়ী করছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতেও তারা অক্ষম। কারণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটদের উপরই নির্ভর করে তাদের ক্ষমতার মসনদ। মন্ত্রী-এমপিরাও ব্যবসায়ী। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে আওয়ামী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মজুতদারী, অতি মুনাফা, লুটপাট, দুর্নীতি- যাদের সাথে আমলাদের একটা অংশও জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার বাগাড়ম্বর করেছেন বছরের পর বছর ধরে। হাতিরঝিলে ১০ কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ উৎসবে লোডশেডিং যাদুঘরে পাঠানোর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মাত্র ৪ মাস পর সারাদেশে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকাভিত্তিক ১-২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী নিজে দিলেও বাস্তবে শহরে লোডশেডিং হচ্ছে যখন তখন, দিনে ২-৪ ঘণ্টা। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে বিদ্যুৎ থাকে না দিনে ৬-৭ ঘণ্টার বেশি। বাসাবাড়ীর রান্নার গ্যাসের অপ্রতুলতা এলাকা ভেদে সারা বছরই।
লোডশেডিং-এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের সরবরাহ কম। বিদেশে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। ফলে আমদানি খরচ বেশি, তেল বাঁচাতে হবে, তাই লোডশেডিং। গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ-এর দাম বৃদ্ধির ষড়যন্ত্রও চলছে।
এর জন্যও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমেরিকা-জোট কর্তৃক রাশিয়ার উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারির যুক্তি দেয়া হচ্ছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার বিষয়টা যে ছিল সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর একটা কর্মসূচি এবং নিজেদের ঘরাণার ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করার কর্মসূচি তা এতে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মাসেতুর গলাবাজি এখানে হচ্ছে না কেন?
দেশে প্রচুর গ্যাস আছে। সরকার এই গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা না করে বিদেশ নির্ভর জ্বালানি নীতি নিয়েছে। ২০১৬ সালে হাসিনা-আওয়ামী সরকারের পাওয়ার সিষ্টেম মাষ্টারপ্ল্যানে জ্বালানি আমদানির ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ভাড়াভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল এ সরকার। দুই বছর মেয়াদের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আরো বাড়িয়ে মালিকদেরকে বিরাট মুনাফা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে সরকার। উৎপাদন-সক্ষমতা অনুযায়ী কখনোই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় নি। না হলেও তাদেরকে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে চলেছে। জানা যায় গত এক বছরে এ জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ৫৪ হাজার কোটি টাকা গুণেছে সরকার।
বিদেশ-নির্ভরতা, লুট-পাট, অতিমুনাফা এবং দুর্নীতি হচ্ছে এই লোডশেডিংয়ের মূল কারণ। গ্যাস ক্ষেত্রে ৭% লুটপাট হচ্ছে। এটা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কিউবেক ঘনফুট গ্যাসের দামের সমপরিমাণ।
সরকার পদ্মাসেতু এবং সড়ক-কেন্দ্রীক পরিবহণ খাত পরিচালনা করে ডিজেলের বর্ধিত চাহিদা সৃষ্টি করেছে।
সরকার জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচে সাশ্রয়ী হতে বলেছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপি, কর্মকর্তা এবং উচ্চবিত্তদের ঘরের এসি এবং প্রাইভেট কার বন্ধ করলে অনেক জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে। কিন্তু সরকার সেসব না করে তাদের সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে।
অথচ ইতিমধ্যে চিটাগাং-এ সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
এগুলো কিসের আলামত? বিদ্যুৎ-ডিজেল-সারের অভাবে কৃষিপণ্য এবং আমন ধানের উৎপাদন কমে যাবে। কারকারখানার উৎপাদন কম হলে রপ্তানি কমে যাবে এবং ডলারের রিজার্ভও কমে যাবে। সরকারের সংকট আরো ঘনীভূত হবে। এখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং সারের মূল্য বৃদ্ধি করলে দ্রব্যমূল্য আরেকদফা বাড়বে। তাই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে কিনা তা আগামীতে দেখার বিষয়। শ্রীলঙ্কায় তো এমন উন্নয়নই ছিল; এবং তা ফেসে যেতে বেশি সময় লাগেনি।
আজকে দেশে এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এবং সাম্রাজ্যবাদীরা। সাম্রাজ্যবাদীরা নিজ নিজ আধিপত্য বিস্তারে যুদ্ধ বাধিয়ে বিশ্বের জ্বালানি, খাদ্যপণ্য সহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি করে বিশ্ব জনগণকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর হাসিনা-আওয়ামী সরকার সেই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর উন্নয়নের গান গেয়ে দেশকে আজ মহাসংকটের মুখে এনে ফেলেছে। তারা নিজেদের এ সংকট জনগণের উপর চাপিয়ে শেষরক্ষা করতে চাচ্ছে। কিন্তু সেটা শেষপর্যন্ত হবে কিনা তা জনগণের আন্দোলন ও সরকারের বিদেশি প্রভুদের দ্বন্দ্বের উপর নির্ভর করবে। কিন্তু জনগণকে নির্ভর করতে হবে নিজেদের শক্তির উপর। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর উন্নয়ন আর সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর আন্দোলন একই বিষয়।
- চলতি বছরে দেশে খাদ্যদ্রব্য চাহিদা এবং আমদানি পরিস্থিতি
- - চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ টন, আমদানি ৭ লাখ টন।
- - গমের চাহিদা ৭৫ লক্ষ টন, আমদানি ৬৪ লক্ষ টন।
- - ডালের চাহিদা ২৬-২৭ লক্ষ টন, আমদানি ১৭ লক্ষ টন।
- - পেঁয়াজের চাহিদা ৩৫ লক্ষ ৫০ হাজার টন, আমদানি ৫.৫০
- লক্ষ টন (চলতি অর্থ বছরে এ পর্যন্ত)।
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা মোট ২২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল গত ২২এপ্রিল ১৪ হাজার ৭৮২ মেগওয়াট। ১৯ জুলাই থেকে ডিজেল চালিত ১ হাজার ৪৯০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। দৈনিক উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। দেশে দিনে গ্যাসের সরবরাহ হতো ৩ কোটি ৩০ লাখ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটের মত দেশীয় খনি থেকে আসা গ্যাস। বাকি ১ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে আমদানিকৃত গ্যাসের সরবরাহ ৫০ লাখ ঘনফুটে নেমে এসেছে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র